আগামীর রাষ্ট্র ও রাজনীতির কেন্দ্রে থাকবে এআই
- আপডেট সময় : ১১:০৮:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমান সময়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতির সব থেকে বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে। পিডাব্লিউসি একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ১৫.৭ ট্রিলিয়ন ডলার যুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র-রাজনীতি কোনো কিছুই এর প্রভাববলয়ের বাইরে থাকবে না। আগামী দিনের রাজনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব থাকবে সবচেয়ে বেশি, এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজনীতিতে ডেটা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করে ২০১২ ও ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের সময়ে। ক্যামব্রিজ অ্যানালেটিকা মার্কিন মুলুকে নির্বাচন জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশেই ডেটা ও এআই-ড্রিভেন পলিটিক্সের প্রচলন শুরু হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফেক ও ডিপফেক ভিডিও, পাবলিক সেন্টিমেন্ট মনিটরিং এবং সোশ্যাল মিডিয়া বট সিস্টেমের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করা গেছে।অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউট সরকার ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ভবিষ্যতের সরকারব্যবস্থার ‘পলিসি মেকিং’ অংশের অধিকাংশই হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সিমুলেশননির্ভর। একই সঙ্গে নাগরিক পরিষেবার বেশিরভাগই হবে অটোনোমাস সিস্টেমনির্ভর। অনাগত ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এযাবৎ প্রায় ৫০টির অধিক দেশ ‘এআই অ্যাডপশন স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও কার্যকর হয়ে উঠবে এবং এর মূল হাতিয়ার হবে এআইভিত্তিক পলিসি সিমুলেশন, স্মার্ট সিটি এবং অটোমেটেড সিটিজেন সার্ভিস। ভবিষ্যতে আমরা তুলনামূলক দক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা পেলেও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল নজরদারি ও নাগরিকদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের কারণে ‘ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদী’ রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরকার ও রাজনীতিতে গতিশীলতা আনলেও পক্ষপাতিত্ব, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন এবং ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে নতুন মাত্রার বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই অভাবনীয় উত্থানের ফলে রাজনীতিতে ‘মেরুকরণ’ এবং ‘জনতুষ্টিবাদ’-এর সমস্যা প্রতিনিয়ত প্রকট হচ্ছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এর সবচেয়ে বড় প্রয়োগ দেখা গেছে ব্রিটেনের ‘ব্রেক্সিট রেফারেন্ডাম’-এর সময়। এ বাস্তবতায় বর্তমান সময়ের রাজনীতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘ইনফরমেশন অ্যান্ড ন্যারেটিভ ব্যাটেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা অথবা নিজের পক্ষে জনমত গঠন করার ক্ষেত্রে অনেকেই ‘মিসইনফরমেশন বা অপতথ্য’-কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ যেকোনো সত্য সংবাদের তুলনায় প্রায় ৬ গুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষ-লক্ষ অটোমেটেড বট আইডিভিত্তিক ক্যাম্পেইন পরিচালিত হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগোরিদম ব্যবহারকারীদের তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার ‘ইকো-চেম্বার’ ও ‘ইনফরমেশন বাবল’-এ আবদ্ধ করে ফেলছে, ফলে ব্যবহারকারীরা উন্মুক্ত ভাবনার জগতে প্রবেশ করতে পারছে না। ভবিষ্যতে রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক বট সিস্টেম, মিসইনফরমেশন এবং ইকো-চেম্বারভিত্তিক সমস্যা আরও প্রকট হবে।বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ক্ষমতার ধরণ ও প্রকৃতির রূপান্তর ঘটেছে। পূর্ববর্তী সময়ে ক্ষমতার উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো ভূখ- ও সামরিক শক্তি; বর্তমানে ডেটা এবং অ্যালগোরিদম ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। মেটা অথবা গুগলের মতো বৈশ্বিক টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জনমত ও তথ্যপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর ফলে রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে নতুন ধরনের ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের চেয়েও অধিক ক্ষমতাধর হয়ে উঠছে।গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও এই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। একদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে, অন্যদিকে এআইভিত্তিক টার্গেটেড প্রচারণা ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে। ডিপফেক প্রযুক্তি এবং অ্যালগোরিদমিক পক্ষপাত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে। বৈশ্বিক রাজনীতিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার এআই উন্নয়ন প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্যের পালাবদল নির্ধারণ করতে পারে।এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, অ্যালগোরিদমের স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় এআই ব্যবহারের সীমারেখা নির্ধারণ করা এখন অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। অন্যথায় প্রযুক্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।ইতিবাচকভাবে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রাজনীতিকে আমূল পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে। তবে প্রযুক্তি নিজে নিরপেক্ষ, এর ব্যবহারই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা কেমন হবে। আগামীর রাজনীতি হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত হবে, কিন্তু সেই রাজনীতিকে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাখার দায়িত্ব মানুষের হাতেই থাকবে।
লেখক: প্রকৌশলী
fazlyrabbi77@gmail.com









